আফগানিস্তানে নান্দনিক জামের মিনার ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

৬৫ মি. লম্বা এই মিনার বারশ শতকের ১টি অপূর্বসুন্দর ও সুউচ্চ স্থাপত্যকলা। ইটের বিস্তৃত কারুকাজের সাথে নীল টাইলসের দেয়ালিকা ও নকশা সামগ্রিকভাবে একে স্থাপত্যকলা ও শিল্পের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন হিসেবে পরিনত করেছে। যা এই অঞ্চলের নির্মানশৈলী এবং প্রচলিত ধারার বহিঃপ্রকাশ। ঘুর প্রদেশের প্রানকেন্দ্রে সুউচ্চ পর্বত ও উপত্যকার মাঝে প্রবাহিত নদী এর চমক বহুগুন বাড়িয়ে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক গুরুত্ব

মিনার এর ৯ মিটার চওড়া অষ্টভুজাকার ভিত্তিপ্রস্তর থেকে চারটি সুউচ্চ ক্রমশ সরু হয়ে উত্থিত চোঙাকৃতির খাজ বের হয়েছে। সম্পূর্ণ মিনারটি জ্যামিতিক নকশা ওফিরোজা রঙ এর মার্বেল পাথর দিয়ে সাজানো। মহান ঘুরি সুলতান (১১৫৩-১২০৩) ১১৯৪ সালে এটি নির্মান করেন। এই মিনার স্থাপনাটি প্রাচীন শহর ফিরুজকুহ এর অস্তিত্বের চিহ্নস্বরুপ ও একইসাথে এটি ঘুরি সাম্রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী বলেও পরিচিত ছিল। মিনারের চারপাশে কুশকাক পাহাড়ের উপর থেকে ১১শ ১২শ শতকের প্রাচীন হিব্রু শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও মিনারের পূর্ব দিকে হারি নদীর তীরে ঘুরি সুলতান আমলের কিছু ধ্বংশাবশেষ এবং টাওয়ার এর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলেছে জানা যায়।

শিল্প সংস্কৃতির বিকাশ

জামের মিনার সেইসকল অল্প কিছু সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম যাতে রয়েছে অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী সৃষ্টিশীলতার ছোয়া এবং তৎকালীন স্থাপত্যকলার দহ্মতা ও উন্নতির প্রকাশ ঘটায়। শিল্প ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এর স্থাপত্য এবং বাহারি নকশা পরবর্তীতে ঐ প্রদেশের শিল্প সংস্কৃতির বিকাশে এবং নির্মানশৈলীতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এই দৃষ্টিনন্দনীয় সুউচ্চ স্তম্ভটি কেন্দ্রীয় এশিয়া মহাদেশের ইসলামিক যুগের স্থাপত্যবিদ্যার ও মননশীলতার অন্যতম চমৎকার উদাহরণ । যা পরবর্তী অন্যান্য অঞ্চলের নির্মানপদ্ধতিতে প্রভাব ফেলে, যার কারণে দিল্লিতে কুতুব মিনারের নির্মান শুরু হয় ১২০২ সালে আবং শেষ হয় ১৪ শ শতকে।

প্রত্নতাত্ত্বিক তাৎপর্য ও মানদণ্ড

জামের মিনার এর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী  ও নজরকাড়া সৌন্দর্য পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্য এবং শিল্পের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

* মিনার ও তা সংশ্লিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ১২শ থেকে ১৩শ শতকের ঘুরি সাম্রাজ্যের জীবনযাত্রার মান ও শক্তি, বিত্তবৈভবের অনন্য সাধারণ সাহ্মী হিসেবে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

* এটি আফগানিস্তানের উত্তর অঞ্চলের তৎকালীন ইসলামিক স্থাপত্যকলা ও অলংকরনের চমৎকার উদাহরণ তথাপি পরবর্তী প্রচার প্রসারে ভুমিকা পালন করেছে।

অখণ্ডতা

যেহেতু মিনার ভবনটি আনুমানিক আটশ বছরের পুরনো, এই এলাকাতে আর কোন পুনঃসংস্কার কিংবা সম্প্রসারণের কাজ হয়নি বললেই চলে। ১৯৫৭ সালে প্রথম যখন প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই নিদর্শনটি আবিষ্কার করেছিল, তখনই জরিপের মাধ্যমে এর তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করা হয়। উত্তরোত্তর ভূমি জরিপ ও গবেষণার ফলে মিনারের মুল ভিত্তির স্থিতিশীল ও সংরক্ষণমূলক ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে করে শুধু আফগানিস্তানের জামের মিনার নয়, এর আশেপাশের পার্শ্ববর্তী স্থলভাগ এলাকায় আরও যত গুলো প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বহনকারী স্থান কিংবা ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে, সেগুলোর আন্তর্জাতিক মান ও মুল্য যাতে অহ্মুন্ন থাকে সেই ধরনের ব্যবস্থার আওতাভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

সত্যতা

জামের নান্দনিক মিনার ও তার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবশিষ্টাংশ স্থাপনাসমুহ কখনো তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সত্যতা কিংবা প্রাচীনত্ব নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। মিনারটি সবসময়ই বিশেষজ্ঞদের কাছে স্থাপত্যসৌন্দর্য ও চমৎকার অলংকরনের অনবদ্য নিদর্শন ও  সুন্দরের পূজারিদের নিকট অন্যতম একটি সেরা শৈল্পিক কাজ রুপে সমাদৃত হয়েছে। এর কুফিক দেয়ালিকা সংযুক্ত স্মৃতিসারক মিনারের নির্মাতার প্রত্যন্ত এবং গৌরবজ্জল ইতিহাস, উৎপত্তির সাহ্ম্য বহন করে এছাড়াও নির্মানের সময়কাল  এবং এর প্রাচীনত্ব সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণ বহন করে, কোন পুনঃনির্মান অথবা উন্নত সংস্কার ও সম্প্রসারণ এর কাজ এই স্থানটিতে এখন পর্যন্ত করা হয়নি।

প্রয়োজনীয় সংরহ্মন এবং ব্যবস্থাপনা

মিনার ও আফগানিস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ব্যপারে সকল আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত কার্যকরী পদহ্মেপ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ইসলামিক প্রজাতান্ত্রিক আফগানিস্থানের তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রিপরিষদ অন্তর্ভুক্ত “ঐতিহাসিক স্মৃতিস্থাপনা” বিভাগ এর পহ্ম থেকে। যেই নির্দিষ্ট আইনের অধীনে স্মৃতিস্তম্ভ ও তার স্থলভুমি সংরক্ষিত করা হচ্ছে তা হল ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ক আইন ও ধারা (আইন ও বিচার বিভাগ,২১ মে,২০০৪), এটি এখনো কার্যকর আছে এবং আর্থিক ও স্থাবর সম্পদের ভিত্তি প্রদান করছে।

এই ঐতিহাসিক সম্পদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের বিপদাপন্ন স্থানের তালিকা থেকে মুছে ফেলা হবে, যখন এর সংরক্ষণের পর যথাযথ অবস্থা ও স্ব-মহিমায় ফিরে আসবে (31 com.7a,20) অনুসারে। আফগানিস্তানের তথ্য ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়, যারা এই নিদর্শন রহ্মনাবেহ্মনের দায়িত্বে আছেন তাদের সক্রিয়তা, পারদর্শীতা এবং গুরুত্ব অনুধাবনের ব্যপারে এর মাধ্যমে ধারনা পাওয়া যায়। বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত স্থান,সুনির্দিষ্ট সীমারেখার আওতায় আনা,নিরাপদ অঞ্চল চিহ্নিত করা, মিনারের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও সংরক্ষণের নিশ্চয়তা, নির্মানভূমির নিরাপত্তা এবং একটি সুচিন্তিত ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ পদ্ধতি কার্যকর ও উন্নয়ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

প্রয়োজনীয় সংরহ্মন এবং ব্যবস্থাপনা

মিনার ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশ রহ্মনাবেহ্মনের প্রস্থাবটি বৈজ্ঞানিক বিচার বিশ্লেষণ ও নিরীহ্মার অধীনে আছে। মিনার সংলগ্ন নদী তীরগুলোর হ্ময় হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর দেয়া হবে। তাছাড়া অন্য কোন সমস্যা যেমন ঐতিহাসিক নিদর্শনের কাঠামোগত যেকোনো অবহ্ময় জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর করে ব্যবস্থা নেয়া, অথবা যেকোনো প্রতিকূল ও বিরুপ অবস্থাকে মোকাবিলা করা ও বিপদমুক্ত করা, পাশাপাশি স্থিতিশীল প্রতিরহ্মামুল্ক যথাপযোক্ত পদহ্মেপ নেয়া হয়েছে এবং দূরবর্তী অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও স্মৃতিবিজড়িত ভূমিগুলো নিরীহ্মনের আওতাভুক্ত রয়েছে।টেকসই ও স্থায়ী গবেষণা কর্মকান্ড, জনসাধারনের মধ্যে সচেনতাতাবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

তথ্য সংগ্রহ : হাসনাত শৈলী

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন