ইরাকের শক্তিশালী ইসলামী সামারা প্রত্নতাত্ত্বিক শহর

সামারা প্রত্নতাত্ত্বিক শহর একটি শক্তিশালী ইসলামী রাজধানী শহর, যা এক শতাব্দী ধরে তিউনিশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত আব্বাসীয় সাম্রাজ্য দ্বারা শাসিত হয়েছিল। এই শহরটি বাগদাদ শহরের ১৩০ কিলোমিটার উত্তরে টাইগ্রিস নদীর উভয় পাশে অবস্থিত, উত্তর থেকে দক্ষিণের দৈর্ঘ্য ৪১.৫ কিমি এবং এর প্রস্থ ৮ কিলোমিটার থেকে ৪ কিলোমিটার এর মধ্যে বিস্তৃত। এই শহরটি স্থাপত্য ও শৈল্পিক উদ্ভাবনের সাক্ষ্য দেয় যা সেখানে বিকশিত হয়েছিল।এই নিদর্শন বিশ্বের অন্যান্য ইসলামী অঞ্চলসহ তার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। নবম শতকের গ্রেট মসজিদ এবং এর সর্পিলাকার চূড়াটি এই শহরের অসাধারণ স্থাপত্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। যার শতকরা ৮০ ভাগ খনন করা বাকী আছে।

প্রাচীন সাম্রারাজ্যে

প্রাচীন সাম্রারাজ্যের রাজধানী সামারা যার সময়কাল ছিল ৮৩৬-৮৯২, এ সময়ে আব্বাসীয় খিলাফতের অসামান্য নজির পাওয়া যায়। সামারা সেই সময়ের প্রধান ইসলামী সাম্রারাজ্য ছিল, যা তিউনিশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি একমাত্র টিকে থাকা ইসলামী রাজধানী যা তার আসল পরিকল্পনা, স্থাপত্য এবং শিল্পগুলিকে ধরে রাখতে পেরেছে।যেমন-সে সময়কার মোজাইক এবং ভাস্কর্য। প্রাচীন শহর হিসেবে সামারার সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল অন্যতম তাই দীর্ঘ স্থায়ী শহরগুলির স্থায়ী পুনর্নির্মাণ এড়াতে পেরেছিল, যদিও এই শহরটি দ্রুত পরিত্যক্ত হয়েছিল।

রাজধানী সামারা

বাগদাদের পর আব্বাসীয় খিলাফতের দ্বিতীয় রাজধানী ছিল সামারা। বাগদাদের স্মৃতিস্তম্ভগুলির অবক্ষয়ের পরে সামারা আব্বাসীয় খিলাফতের প্রকৃত চিহ্ন বহন করে। এই শহর দুটি বৃহত্তম মসজিদ (আল মালওয়াইয়া এবং আবু দুলাফ) এবং লক্ষণীয় মিনার সংরক্ষণ করে, এর পাশাপাশি ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন বৃহত্তম প্রাসাদ যেমন- খলিফা প্রাসাদ কাশর আল-খলিফা, আল-জাফারী, আল মাশুক ইত্যাদি সংরক্ষণ করে।এ সময় এক বিশেষ ধরনের খোদাইকৃত কাঠামোর আর্বিভাব ঘটে যা সামারা শৈলী নামে পরিচিত ছিল যা ইসলামী বিশ্বের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সামারায় একটি নতুন ধরণের সিরামিক প্রচলিত ছিল যার নাম লাস্টার ওয়েয়ার। এই সিরামিকটি সোনা ও রূপার মতন ধাতুর তৈরি বহুমূল্য জিনিসপত্র তৈরীতে ব্যবহার করা হত।

মানদন্ড

সামারা আব্বাসীয় যুগের বিশেষ স্থাপত্যশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে। লাস্টার ওয়েয়ার নাম একটি নতুন ধরণের সিরামিক সামারায় প্রচলিত ছিল। সোনা ও রূপা দ্বারা যেমন বহুমূল্য জিনিসপত্র তৈরি হত ঠিক তেমনি এই সিরামিক দিয়ে সেই সময়কার মসজিদ এর উন্নয়ন, রাস্তাগুলির পরিকল্পনা, বিভিন্ন স্থাপত্যশিল্পের সজ্জার কাজ সাধিত হত। আব্বাসীয় খিলাফতের স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার সেরা উদাহরণ হল সামারা, যা তিউনিশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

এই সাম্রারাজ্যের স্থাপত্যগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি কারণ এর বেশিরভাগই যেসব ইট দ্বারা নির্মিত হয়েছিল সেগুলোর গুনগতমান খুব একটা ভালো ছিল না।

স্থাপত্য শিল্প

সামারায় নির্মিত মসজিদগুলো- আল মালওয়াইয়া এবং আবু দুলাফ এর নির্মাণকৌশল, ধারণক্ষমতা ইসলামী যুগের বিশেষ স্থাপত্য শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে যা পূর্বে নির্মিত স্থাপত্যশিল্পগুলোর তুলনায় অধিক আর্কষনীয় ছিল। এই মসজিদগুলির অনন্য নির্মাণকৌশল ও সুউচ্চ চূড়ার জন্য এগুলো সেই সময়ের গর্ব এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তি প্রদর্শন করে যা সেই সময়ের সাম্রারাজ্যের শক্তি ও গর্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০০৩ সালে যখন ইরাকের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন এই সাম্রারাজ্যটি   মাল্টি-ন্যাশনাল বাহিনী দ্বারা দখল হয় যা কিনা সামরিক অভিযানের জন্য একটি থিয়েটার হিসাবে ব্যবহার হয়েছিল।

এই প্রক্রিয়া অনেক নিখুঁত ও নির্ভেজাল ছিল যা মূল্যায়নের জন্য কোন প্রযুক্তিগত কৌশল এর প্রয়োজন হত না। এই সাম্রারাজ্য পরিত্যক্ত হওয়ার পরে আধুনিক শহরের প্রাণকেন্দ্র কয়েকটিতে কর্মজীবন অব্যাহত ছিল তবে বাকী অংশগুলো ২০ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত কর্মক্ষেত্র হতে বিচ্যুত ছিল।

স্থাপত্য শিল্প

চাষ এবং চাষের কারণে এই সাম্রারাজ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গাগুলোর ক্ষতি সাধিত হয় যার ফলে এই জায়গাগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় নাই। যদিও এই ক্ষতির পরিমাণ অন্যান্য বৃহত্তর জায়গাগুলোর তুলনায় সামান্য ছিল। এর পুনরুদ্ধারের কাজ আর্ন্তজাতিক মানসম্মত ছিল। এই সাম্রারাজ্যের প্রাণকেন্দ্র এবং সাধারণ স্থানগুলোর পুনরুদ্ধারের কাজের মধ্যে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা বাস্তবসম্মত এবং যথার্থ বলে মনে করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রীয় দল এই সাম্রারাজ্যকে চাষাবাদ বা শহরায়ন এর অনুপ্রবেশের হাত হতে সুরক্ষিত রেখেছিল। এই সাম্রারাজ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিগুলো ২০০৩ সাল পর্যন্ত স্থগিত ছিল। এই সাম্রারাজ্য ধংসের প্রধান ঝুঁকি সৃষ্টি হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এর পরিচালনা ও সংরক্ষণের উপর নিয়ন্ত্রণ হীনতার ।  

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন