প্রাকৃতিকভাবে শারীরিক তাপ হ্রাস করার সহজ উপায়

প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের তাপ কমানো এমন কঠিন কিছু নয়। কিছু পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি এই কাজটি করতে পারবেন। আপনি শুধু শরীর ঠান্ডা করতে চান নাকি জ্বর কমাতে চান আগে সেটা ঠিক করা প্রয়োজন। প্রচুর তরল বা তরল জাতীয় খাবার গ্রহণের মাধ্যমে আপনি ঘরোয়া ভাবে শরীরে পানি শুন্যতা কমাতে পারেন। আরো কিছু প্রতিকারের উপায় আছে যেমন আপনার পা পানিতে ভেজানো বা উষ্ণ স্নান গ্রহণ। তবে, হিটস্ট্রোক থেকে গুরুতর জ্বর পর্যন্ত, কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। যদি আপনি গুরুতর লক্ষণগুলি দেখেন, তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইমার্জেন্সি সার্ভিসের সাথে যোগাযোগ করুন। আজকে আমরা প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের তাপ কমানো যাবে এমন কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো। চলুন তাহলে শুরু করি।

১ম পদ্ধতি

ঢিলাঢালা, হালকা ওজন এবং হালকা রঙের পোশাক পরুন। যদি সম্ভব হয়, পোশাকের বাড়তি অংশ খুলে রাখুন এতে প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের তাপ কমানো যাবে। সিল্ক, শিফন, পাতলা সুতি এবং লিনেনের মত হালকা ওজনের কাপড়গুলি চরম গরমের জন্য উপযুক্ত। সাথে সাদা এবং অন্যান্য হালকা রং পরতে চেষ্টা করুন, যা সূর্যালোক প্রতিফলিত করে তাপকে হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে।

ফ্যান বা এয়ার কন্ডিশন

যদি সম্ভব হয়, একটি এয়ার কন্ডিশনাল স্পট খুঁজে নিন। আপনার বাড়িতে যদি না থাকে, সিনেমা থিয়েটার, বা বন্ধুর বাড়িতে যেখানেই হোক এয়ার কন্ডিশনার এর মধ্যে কিছুটা সময় চেষ্টা করুন এতে খুব কম সময়ে শরীরের বাড়তি তাপ কমে আসবে। একটি ফ্যানের সামনে বসেই এটা করা যেতে পারে।

* আপনার যদি শুধুমাত্র একটি ফ্যানের ব্যবস্থা করতে পারেন তবে ত্বক ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিন, এটি আপনার ত্বকে দারুন চমৎকার একটি ঠান্ডা অনুভুতু এনে দিবে।  

মৃদু গতিতে, দীর্ঘসময় নিজেকে বাতাস করুন।

* যদি আপনি একটি এয়ার কন্ডিশনার বা একটি বৈদ্যুতিক ফ্যান না পান তাহলে  হাত দিয়ে নিজেকে বাতাস করে আপনার তাপমাত্রা কমান।  

* আপনি যদি খুব দ্রুত গতিতে বাতাস করেন তবে, আপনার রক্ত পাম্প হবে বেশি এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। মৃদু গতি আপনার ত্বকের উপর ঘামের সৃষ্টি করবে যা আপনার তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করবে।
* বাতাস করার সময় আপনার ত্বককে ঠান্ডা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিন, এটা আরো সহায়ক।     

শিথিলায়ন আসন

আরাম করে বসুন এবং ধীর, গভীর শ্বাস গ্রহণ করার চেষ্টা করুন, এতে খুব দ্রুত  প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের তাপ কমানো যাবে। ৪ গননা পর্যন্ত আপনার শ্বাস টানুন, ৭ গননা পর্যন্ত ধরে রাখুন এবং ৮ গননা পর্যন্ত ধীরে ধীরে  শ্বাস ফেলুন। আপনার হৃদস্পন্দন কমাতে এবং আপনার মূল তাপমাত্রা কমাতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য আপনার নিয়ন্ত্রিত শ্বাসের ব্যায়াম করুন।

* যদি এটি সাহায্য করে, কিছু হালকা সঙ্গীত বা রেকর্ডিং করা প্রাকৃতিক শব্দ শুনতে পারেন এর সাথে।

* আপনি মেডিটেশন করার চেষ্টা করতে পারেন। এ ব্যাপারে ইউটিউব থেকে সাহায্য নিতে পারেন।

পা ভেজান

একটি পাত্রে ঠান্ডা পানি এবং বরফ নিন তারপর তাতে আপনার পা ডোবান। ভাল ফলাফলের জন্য, অন্তত ৬০ মিনিটের জন্য রাখুন।

* যদি আপনার শুধু কিছুটা ঠান্ডা করার প্রয়োজন হয়, যতক্ষণ আপনি চান ততক্ষণ তাদের রাখতে পারেন। যদি আপনি আপনার শরীরের তাপমাত্রা (উদাহরণস্বরূপ, একটি জ্বরের কারণে) নামিয়ে আনতে চান, ৬০ মিনিটের বেশি সময় ধরে ডুবিয়ে রাখুন। ৬০ মিনিটের কম সময়ে তাপমাত্রা কমে না।

* পানি গরম হতে শুরু করলে পাত্রে আবারো ঠান্ডা পানি এবং বরফ দিন।

যদি আপনি জ্বর কমিয়ে আনতে চান, তবে ঠাণ্ডা পানিতে গোসলের চেয়ে কুসুম গরম পানিতে গোসল করা ভালো। ঠান্ডা পানির কারনে কাঁপুনি হলে আপনার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বাড়তে পারে।

* আপনি যখন গোসল করবেন বা স্পঞ্জ করবেন তখন ফ্যানের বাতাসের মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন। এতে দ্রুত কাজ হবে।

২য় পদ্ধতিঃ  খাদ্য এবং পানীয়

বার বার অল্প পরিমানে ঠান্ডা পানি পান করুন। পানি প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের তাপ কমানো এর কাজে সাহায্য করে এবং ঘাম হওয়ার ফলে আপনি যে তরল হারিয়েছেন তা পূরণ করে। একবারে বেশী পানি পানের চেয়ে প্রতি ১৫ মিনিট পর পর ৬ থেকে ৮ আউন্স (১৭৭ থেকে ২৩৭ মিলিগ্রাম) পানি পান করা বেশি কার্যকর।

* খুব ঠান্ডা পানির পরিবর্তে অল্প ঠান্ডা পানি পান করুন। বেশী ঠাণ্ডা পানিতে পেট মোচড়ানো বা মাথাব্যাথা হতে পারে।  

একটি স্পোর্টস ড্রিঙ্ক নিন

যদি আপনি গরম আবহাওয়াতে কাজ করেন বা ব্যায়াম করেন, তাহলে আপনার শরীরের পানি শুন্যতা পুরনের জন্য একটি স্পোর্টস ড্রিঙ্ক নিন। ঘামের সাথে বেরিয়ে যাওয়া লবণ এবং অপরিহার্য খনিজ পূরণ করবে এই পানীয়।

* হাইড্রেটেড থাকা জরুরি, তাই সোডা এবং অন্যান্য চিনিযুক্ত পানীয়, অ্যালকোহল, এবং ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা উচিত।

* আপনি ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় যেমন পেডীয়ালাইট ব্যবহার করতে পারেন।

* খেয়াল রাখুন যেন এটি স্পোর্টস ড্রিঙ্ক হয়, এনার্জি ড্রিঙ্ক নয় কারন এতে থাকা ক্যাফেইন শরীরের তাপমাত্রা বাড়াতে পারে।

* আপনার স্পোর্টস ড্রিংসের চিনির উপাদানটিও দেখুন।এটি উচ্চ ক্যালোরির পানীয় হতে পারে।

বরফ কুঁচি চিবান

এটি আপনাকে একটি রিফ্রেশ, ঠান্ডা অনুভূতি প্রদান ছাড়াও শরীরের তাপমাত্রা কমাতে পারেন।

* মনে রাখবেন আপনার হাইড্রেটেড থাকা জরুরি। এক গ্লাস পানি আপনাকে যতটা হাইড্রেট করতে পারে, এক টুকরো ছোট বরফ কখনই তা পারবে না।

পানি ধারন করে এমন খাবার

সাধারণভাবে, প্রচুর পানি ধারন করে এমন খাবার আপনার তাপমাত্রা কমাতে পারে। যেমন তরমুজ, শশা ইত্যাদি।

* প্রচুর পানি ধারণ করে এমন খাবারগুলি হজম করা সহজ। এই ধরনের খাবার শরিরে কম তাপ উত্পাদন করে।

অ্যালকোহল, ক্যাফেইন এবং চিনির ব্যবহার এড়িয়ে চলুন

যখন আপনার ঠান্ডা থাকা প্রয়োজন তখন ঠান্ডা বিয়ার, বরফ মেশানো কফি, মিষ্টি চা, বা স্পোর্টস ড্রিংক (কিছু স্পোর্টস ড্রিংকেও উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন এবং চিনি থাকে) ইত্যাদি পানের আগ্রহ জাগে। তবে পানীয় গুলি গ্রহনের ফলে শরীর ডিহাইড্রেড হতে পারে।

যে সব খাবারে উচ্চ মাত্রার চর্বি, প্রোটিন, এবং কারবোহাইড্রেড আছে সেগুলো এড়িয়ে চলুন। যখন আপনার তাপমাত্রা বাড়ছে তখন লাল মাংস, বাদাম, এবং বাদামি চাল ইত্যাদি খাবার থেকে দূরে থাকুন।

৩য় পদ্ধতিঃ জরুরী চিকিৎসা

১। যদি আপনার বেশী জ্বর বা গুরুতর লক্ষণ থাকে তাহলে ডাক্তার ডাকুন।

১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইটের বেশি জ্বর (৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে উদ্বেগের একটি কারণ। তিন মাসের কম বয়সের শিশুদের জন্য ১০০.৪ ° ফা (৩৮.০° ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড) হলে ডাক্তারকে ডাকুন।

২। যদি হিট স্ট্রোকের লক্ষণ থাকে তবে জরুরি সার্ভিসে কল করুন।

হিট স্ট্রোক শুধু গরম বা তাপ অনুভূতির তুলনায় আরো গুরুতর, এবং জরুরী চিকিৎসা মনোযোগ প্রয়োজন।

৩।হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত ঠান্ডা স্তানে সরিয়ে নিন। সম্ভব হলে ফ্যানের নিচে রাখুন।

 ঘাড়, কুঁচকি

অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা কালে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আইসপ্যাক এবং ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে তাপমাত্রা কমানো চেষ্টা করুন। আলোচিত পদ্ধতি গুলো ব্যবহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরের তাপ কমানো যাবে সহজেই। আমাদের স্বাস্থ্য টিপস গুলো মেনে চলুন, সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন।

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন