প্রাচীন মায়া সভ্যতার দৃষ্টিনন্দনীয় পবিত্র ও আধ্যাত্মিক ১০টি গুহা

প্রায় একশত বছর ধরে পৃথিবীব্যাপি বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির দ্বারা গুহাগুলো কখনো পূজা, উপাসনা অথবা মৃতদেহ দাফনের জন্য, কখনো বা জটিল ও দুর্বোধ্য হিন্দু দেবদেবী দের মুর্তি আবিস্কার এ, গ্রীক দেবতাদের কিংবদন্তি কিংবা পৃথিবীর গর্ভে লুকায়িত, এসব অন্তরালে থাকা স্থানের পবিত্রতা উন্মোচনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আকতুন তুনিচিল মুকনাল (বেলিজ)

পুরাণ মতবাদ অনুসারে, ভুগর্ভস্থ যাত্রা কখনোই সোজা ছিল না। আকতুন তুনিচিল মুকনাল (পাথুরে ভাস্কর্যের গুহা) দেখার পর আপনার মনে হতে পারে আপনি অন্য কোন এক মহাকাব্যিক জগতে পা রেখেছেন। মায়া সভ্যতার রহস্যের সাথে  এই গুহাতে হাইকিং এবং পানির নিচে সাঁতার কাটতে পারবেন চাইলে। মাটির নিচে প্রায় ১.৬ কি.মি যাত্রার পর দেখতে পাবেন স্স্ফটিক কুমারীর বিশ্রামঘর, একটি  পূর্ন নারী কংকাল যা কিনা ক্যালসিয়াম স্ফটিক রুপান্তরের কারণে নিরন্তর জ্যোতি ছড়াচ্ছে। গুহাতে আরও রয়েছে মায়া তৈজসপত্রর ধ্বংসাবশেষ, একটি খুনে গহব্বর যা অনেকের মতে আত্মাদের পালানোর দরজা বলে পরিচিত।

এলিফ্যান্টা কেভস বা হাতির গুহা, ঘাড়াপুড়ি দ্বীপ (ভারত)

পনেরো শতাকে পাহাড়ের গা ফুড়ে, উচ্ছাসিত রুপ ও দেহবল্লরীর কারুকার্য খচিত হিন্দু দেবতাদের মন্দির ছিল এই হাতির গুহা যা সুপ্রাচীন ও সনাতনী হিন্দু বাদ্যযন্ত্রের তরঙ্গধ্বনি আজও বয়ে চলেছে। দেবতা শিব নটরাজের অপূর্ব তরঙ্গিত নৃত্যমুদ্রা কিংবা বহুহস্ত বিশিষ্ট আদিম নর্তক, ও মূর্তির তিন রুপ একাধারে দেবতা শিবের সৃষ্টি, রহ্মা ও বিনাশ এই তিন চরিত্র প্রকাশ করে। শতাব্দি পুর্বের ন্যায় আজও সমানভাবে তা মূহ্যমান।

লংম্যান গুহা ( চীন )

জিয়াংশান ও লংম্যান শান পর্বতের পাদদেশে, ও হোয়াই নদীর তীরে অবস্থিত লংমান (ড্রাগনের দরজা) হল জটিল একটি বৌদ্ধ মন্দির যাতে রয়েছে সুহ্ম বৌদ্ধ ধর্মীয় কারুকার্য খচিত সম্পদ ও প্রাচুর্য, প্রায় ২৩৪৫ টি গুহা এবং কুলুঙ্গি, ২৪০০ বৌদ্ধলিপি এবং ৪৩ টি মঠ, প্রাচীনতম নিদর্শন উত্তর উই সাম্রাজ্যের।

ডামবুলা গুহা (শ্রীলঙ্কা)

৫টি বৌদ্ধ গুহা ও স্থাপনা নিয়ে গঠিত এই মন্দির রাজা ভালাগাম্বাহুর দ্বারা খ্রীস্টপূর্ব ১ম শতাকে অনুমোদিত হয়েছিল ও প্রায় ২২ শতাব্দী পর্যন্ত তীর্থস্থান রূপে ব্যাবহৃত হত। চমকপ্রদ ও সূহ্ম কারুকাজ, চিত্র এবং আকর্ষনীয় দেয়ালিকা ছাড়াও এখানে রয়েছে খোদাই করা নকশা যা আজও গুহাতে চমক ছড়াচ্ছে। গুহার ছাদের দেয়ালিকা, এবড়োথেবড়ো পাথুরে খাজ কেটে সরাসরি চিত্রিত হয়েছে।

করিসিয়ান গুহা (গ্রিস)

প্রাচীন গ্রিসের প্যারানাস পর্বতের উপর অবস্থিত এই সুবিশাল গুহাটি দেবতা প্যান এর উপাসনা এবং কুমারী পুজার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। গুহার প্রবেশপথের নিকট একটি পাথর রয়েছে যা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হত।

ব্রোন্জ যুগের মিনোয়ান গুহা (ক্রিট)

ক্রিটের চারপাশে প্রায় ৩০০০ এর বেশি গুহা রয়েছে ।যার ভেতর বেশিরভাগই গ্রিক পুরাণ এর দেবতা এবং দেবীর চিত্র যাদের পুজা অর্চনা মিনোয়ান রা করত। ব্রোন্জ যুগের সভ্যতা প্রায় ২৬০০ থেকে ১১০০ খ্রীস্টপূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ডিকটেয়ন গুহাকে বলা হয় সেই স্থান যেখানে রেয়া জন্ম দিয়েছিল দেবতা জিউসকে। এবং ইকডাইয়ান গুহা হচ্ছে যেখানে রেয়া, জিউস দেবতা কে তার পিতা ক্রোনাস থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।

সেন্ট পলস গুহা (মাল্টা)

খ্রিস্ট এর জন্মের সালে,সেন্ট পল নামক একজন রোমান কয়েদি জাহাজ বিধ্বস্থ হয়ে মাল্টায় আসে এবং ছোট গুহাতে আশ্রয় গ্রহণ করে বলে কথিত আছে ।বাইবেলের ২৪ নং ধারা অনুসারে,পল মাল্টাবাসীদের কাছ থেকে খুবই সমাদর এবং আপ্যায়ন পায় একই সাথে সেখানে থাকাকালীন সময়ে সে খুব আশ্চর্য রকমের আরোগ্য হ্মমতা লাভ করে যার ফলে তিনি বিষাক্ত ভাইপার সাপের দংসন সত্ত্বেও বেচে যান এবং স্থানীয় লোকরা তাকে দেবতা ভাবতে শুরু করে।

সেন্ট মাইকেল গুহা (ইতালি)

প্রাচীন খ্রিস্টান ধর্মীয় মতবাদ অনুসারে বলা হয়ে থাকে যে,মন্টে সেন্ট এন্জেলোর এই গুহাটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল আর্কা এন্জেল মিকাইলের মাধ্যমে যিনি ছিলেন সিপেন্টাম এর প্রধান ধর্মগুরু। প্রায় ৪৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি শপথ করেছিলেন যে,যেখানে শিলাপ্রস্তর পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে,সেখানে মানুষের পাপ মুছে যাবে। এরকম কথিত আছে যে মাইকেল ১ টি লাল কাপড় এবং তার পদচিহ্ন পাথরটির উপর দিয়ে রেখেছিলেন জায়গাটি কে চিহ্নিত করার জন্য। (সংযুক্তি : মিট দ্যা ম্যান উইথ দ্যা কিজ টু দ্যা ভ্যাটিকান)।

ফন্টে দে গামা (ফন্টের গামার গুহা) ফ্রান্স

ডর্ডজন এলাকার এই গুহাতে দেয়ালগুলো চুনাপাথর নির্মিত এবড়োখেবড়ো পাথুরে দেয়াল আছে যার উপরে প্রাচীন বিলুপ্ত সব জীবজন্তু যেমন বাইসন ম্যামথ, ঘোড়া এসবের ছবি আাকা হয়েছে।প্রায় ১৫,০০০ বছর আগের তৈরি এসব চিত্রকর্মে এখনো উজ্জ্বল রং এর ছটা এবং জীবন্ত ভাব খুজে পাওয়া যায়। এই চিত্র অংকন কারি গুহাবাসী দের উদ্দেশ্য হয়ত ছিল শিকার করা কিংবা চন্দ্রবর্ষের দিনলিপি তৈরির চেষ্টা করা।সংযুক্তি: ডিসকাভার থ্রি ইনক্রেডিবলস সাইট অফ ইউরোপ )

খলিফা ওমর (রা) এর গুহা (ইথিয়পীয়া)

এটা বলা হয়ে থাকে যে, আনুমানিক ১২০০ শতকে চুনাপাথরে নির্মিত এই গুহার প্রবেশ পথ আল্লাহ তায়ালা হযরত ওমর (রাঃ) এর নিকট প্রকাশ করেন। যার ফলে ওমর (রাঃ) এবং তার সাহাবীরা এই গুহাকে  মসজিদ  হিসেবে ব্যাবহার করা শুরু করেন। এই উদ্দেশ্যেই গুহাতে উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা রাখা হয়েছিল যেমন এর অভ্যন্তরে সারি সারি স্তম্ভ ,পিলার ,খিলান, নানারকম গম্বুজ, কামরা ইত্যাদি দিয়ে সজ্জিত রয়েছে। এটি একটি প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি মার্বেল পাথরের স্থাপ্তত্য নিদর্শন যা আজও স্থানীয় মুসলিমদের পরিদর্শন এবং পদচারণার স্থান রপে গন্য হচ্ছে।

তথ্য সংগ্রহ : হাসনাত শৈলী

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন