বিশ্বের শীর্ষ দশ গুপ্তচর সংস্থা

স্পাই সংস্থা হল দেশের সেরা বুদ্ধিমানদের নিয়ে গঠিত এক বিশেষ ধরণের সংগঠন। প্রকৃতপক্ষে, বৃহত্তর এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের সীমানার ভিতর ও বাইরে এবং সমগ্র পৃথিবীতে কি ঘটছে তা জানার জন্য এই ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসকে কাজে লাগিয়ে থাকে। এই সংস্থাগুলি জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিরীক্ষণের জন্য সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং সরকারি অফিসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকে। কোন গোয়েন্দা এজেন্টকে কল্পনা করলে ক্যাসিনোতে বসে জেমস বন্ডের মার্টিনিতে (বিভিন্ন মদের মিশ্রণ) চুমুক দেত্তয়ার দৃশের চেয়ে সম্ভবত কোনও ভাল উদাহরণ নেই। তবে অবশ্যই সারা বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থার জন্য সবকিছু মজা বা গেম নয়; কাজের মাধ্যমে তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।

poat-image

এমআই৬ ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত নিজের পরিচয় প্রকাশ করেনি। এই গোয়েন্দা সংস্থাটি প্রতি বছর সন্ত্রাস বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ২.৬বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করে। ব্রিটিশরা গোয়েন্দা বিষয়ক বই রচনা করেছিল, তারা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় শত্রুদের গুপ্তচরবৃত্তির উপর নজর রেখেছিল এবং সেই সময় তারাই প্রথম গোয়েন্দাদের নিয়ে কাজ করা শুরু করেছিল। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ব্লেটলি পার্ক এমআই৬ এর জন্য কাজ করত এবং তিনি এনিগমা কোড (হেঁয়ালিপূর্ণ সংকেত) ভেঙ্গে দেয়ার ফলে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ অন্তত এক বছরের মধ্যে সংক্ষিপ্ত হয়েছিল। উপরে উল্লেখিত অনেকগুলো গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্রিটিশরা প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাই তারা শ্রেষ্ঠ এবং গোয়েন্দাদের এই তালিকায় সর্ব প্রথম স্থান অর্জন করেছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে গোয়েন্দাগিরি সম্পর্কে আমাদের অনুপ্রেরণা হচ্ছে জেমস বন্ড। দুসান পোপোভ  একজন সার্বিয়ান ছিলেন যিনি পরে এমআই৬ এর জন্য কাজ করেছিলেন। তিনি প্লেবয় জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিলেন এবং তাকে দেয়া এমআই৬ এর সাহসী এবং ভয়ঙ্কর মিশনগুলোতে অংশ নিতেন। ১৯৪১ সালের আগস্টে পোপোভ আমেরিকান এফবিআইকে পার্ল হারবারে (মুক্তা পোতাশ্রয়) আক্রমণের বিষয়ে আগাম সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার সতর্কবাণীকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়নি কারণ সে সময়ের এফবিআই ডিরেক্টর এডগার হুভার পোপোভকে বিশ্বাস করতেন না। তবে আক্রমণের পরে এফবিআই এর বোধোদয় হয় যে তাদের পদক্ষেপটি ভুল ছিল।

 
poat-image

১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ ১২.৮ বিলিয়ন ডলারের বৃহত্তম বাজেটে পরিচালিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই গোয়েন্দা সংস্থাটি। সিআইএ এর অসংখ্য গোয়েন্দা পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে। এটা বলা হয় যে পৃথিবীতে প্রায় ২১,০০০ গোয়েন্দা নিয়ে গঠিত সিআইএ আমেরিকার বৃহত্তম গোয়েন্দা সংস্থা। সিআইএ ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এমকে-আল্ট্রা এর প্রারম্ভিক সংবাদ বাহক হিসেবে অপারেশন ব্লুবার্ড চালু করেছিল। এই সংস্থাটি উদ্ভট সামাজিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে এলএসডি-২৫- এর জন্য মনোনীতদের দৈনিক মাত্রায় মন নিয়ন্ত্রন পরীক্ষা, কৃত্রিম স্মৃতি ও নতুন পরিচয়পত্র দিয়েছিল এবং গত শতাব্দীতে সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে বেশি তহবিলে পরিচালিত সন্দেহজনক মানব পরীক্ষাগুলি সিআইএ পরিচালনা করছিল। আর এইজন্যই এই সংস্থাটি শীর্ষ দশ এর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

poat-image

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সাহসী এবং প্রশংসার যোগ্য কর্মকাণ্ডের জন্য আইএসআই এই তালিকায় শীর্ষ তিনে রয়েছে। এই সংস্থাটির সূচনা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে একজন অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তার হাত ধরে যিনি ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানী আর্মিতে ছিলেন। ১৯৮০ সালে জাতীয় একটি প্যারেডের সময় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল-হককে হত্যার চক্রান্ত ফাঁস করতে এই গোয়েন্দা সংস্থাটি নেতৃত্ব দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতির অপসারণ এবং একটি চরমপন্থী ইসলামী সরকার ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু প্যারেডের আগেই আইএসআই গোয়েন্দারা হামলাকারীদের ধরতে সক্ষম হয়েছিল।

poat-image

এই তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে এফএসবি যার সদর দফতর রয়েছে মস্কো শহরের কেন্দ্রে লুবিয়াঙ্কা স্কয়ারে। এই সংস্থাটি দেশ এবং দেশের বাইরে সন্ত্রাসবিরোধী অসংখ্য কাজ করার জন্য প্রশংসিত হয়েছে। এই সংস্থা সম্পর্কিত তথ্য রাশিয়ার কাছ থেকে তেমন জানা না গেলেও আমরা নিশ্চিত যে এই গোয়েন্দা সংস্থাটি সীমানা ও এর বাইরের অংশকে নিরাপদ রাখতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

poat-image

ইসরায়েলের মত দেশের নিরাপত্তার জন্য মোসাদ  একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা যার সূচনা হয় ১৯৪৯ সালে। এই সংস্থাটি বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি যেটি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৬০ সালে মোসাদ কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন গারিবাল্ডি নাজি যুদ্ধে পলাতক অ্যাডল্ফ ইচম্যানকে ধরতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গণঅভ্যুত্থানের জন্য দায়ী সাবেক এসএস-লেফটেন্যান্ট কর্নেল আর্জেন্টিনায় পালিয়ে গেলে তিনি মোসাদ এজেন্টদের হাতে ধরা পড়েন, তারপর তাকে ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনা হয় এবং যুদ্ধাপরাধের দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হয় ও ১৯৬২ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যু কার্যকর করা হয়। কেউ কেউ মোসাদকে পৃথিবীর সেরা গোয়েন্দা সংস্থা মনে করলেও বিশ্ব পর্যায়ে তাদের কাজের  তুলনীয় পরিমাণের কারণে এটি এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

 
poat-image

জার্মানির পোলেকে সদর দপ্তরসহ এই গোয়েন্দা সংস্থাটি ১৯৫৬ সালে যাত্রা শুরু করে এবং এটির জন্য প্রতি বছর ৮৩২ মিলিয়ন ইউরো খরচ হয়। এই সংস্থাটি অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, প্রযুক্তির অবৈধ স্থানান্তর ও ব্যবহার, মানি লন্ডারিং এবং অবৈধ অভিবাসনের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। ২০০৩ সালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদকে রক্ষা করতে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল সেখান থেকে দুই বিএনডি এজেন্ট ভাগ্যবশত রক্ষা পেয়েছিল। ইরাকে আক্রমণের এক মাস আগে এই জার্মান গোয়েন্দা সংস্থাটি  মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেছিল এবং বাকিটা ইতিহাসে দৃঢ়ভাবে উল্লেখিত আছে।

poat-image

ফ্রান্সের বিখ্যাত বহির্বিশ্ব বিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থাটি ১৯৮২ সালে প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এই সংস্থাটিকে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭৩০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়। ১৯৮০ সালের গোঁড়ার দিকে একটি সোভিয়েত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক যেটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্কগুলির একটি বলে বিবেচিত হয়েছিল সেটিকে ডিজিএসই খুঁজে বের করে ও তাদের সাথে কাজ করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি যোগ্য গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।

poat-image

১৯৬৮ সালে ভারত-চীন ও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পরই নয়াদিল্লিতে সদর দফতর সহ ভারতের প্রধান গোয়েন্দা বাহিনী “র/RAW” গঠিত হয়। “র” দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন পর্যবেক্ষণ করে থাকে এবং সেই সাথে ভারতের সন্ত্রাস বিরোধী কার্যক্রমে বিশাল ভূমিকা পালন করছে। এজেন্সির নিজস্ব একজন নায়ক আছে যাকে ব্ল্যাক টাইগারও বলা হয় আর তিনি হলেন রবীন্দ্র কৌশিক। রবীন্দ্র কৌশিক একজন থিয়েটার শিল্পী ছিলেন, পরে এই এজেন্সি পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৭৫ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন এবং পাকিস্তান থেকে আইনে ডিগ্রি অর্জন করেন। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার সময়, ব্ল্যাক টাইগার ভারতবর্ষে সামরিক বুদ্ধিমত্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে তিনি ধরা পরেন এবং দুই বছর ধরে তার উপর নির্যাতন চালানো হয়। তারপর পাকিস্তান তাকে কারাদণ্ড দিয়েছিল আর একইসাথে ভারত তাকে জাতীয় নায়ক ঘোষণা করেছিল কারণ বন্দী অবস্থায় থাকলেও বাঘের ক্ষমতা বা শক্তি কমেনা বরং একই থাকে।

poat-image

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের একটি অংশ এবং এটি বৃহত্তর চীন এর তাইওয়ান, ম্যাকাও এবং হংকং এর মত অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের অপারেশনের ব্যাপ্তি সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়, তাই এমএসএস সংস্থাটি এই তালিকায় ৯ নাম্বার স্থান লাভ করেছে।

poat-image

অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সিক্রেট সংস্থা হিসেবে ১৯৫২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এটি প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলারের বাজেটে চলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এবং ব্রিটেনের এমআই৬ এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। ১৯৮৩ সালে মেলবোর্নের শেরাটন হোটেলে একটি ব্যঙ্গ প্রশিক্ষণ মিশনে ব্যায়ামের জন্য হোটেলের স্টাফ এবং অতিথিরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলে এই সিক্রেট এজেন্সি পরিচিতি লাভ করে।

আপনি কি সাহায্য পেয়েছেন

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন নিবন্ধন করুন