শক্তির উৎসের তুলনা - পারমাণবিক শক্তি বনাম সৌর শক্তি: কোনটি ভাল?

জীবাশ্ম জ্বালানির হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী পরিবেশগতভাবে পরিষ্কার শক্তির উৎস খুঁজছে। পূর্বে শক্তির উৎস হিসেবে ছিল বড় বড় কয়লা এবং অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ছাই সমূহ, সেগুলোকে পেছনে ফেলে বর্তমান পৃথিবীর প্রধান দুই শক্তির উৎস হলো - পারমাণবিক শক্তি এবং সৌর শক্তি। পারমাণবিক শক্তি একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভিতরে জমা থাকে, এই পরমাণু থেকে নির্গত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে থাকি। পারমাণবিক বিভাজনের মাধ্যমে মানুষ এই শক্তি তৈরি করতে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে এই পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। সেখানে পরমাণুগুলোকে বিভাজিত করে আরো ছোট ছোট পরমাণু সৃষ্টি করা হয় এবং সেগুলো থেকে নির্গত শক্তি দিয়ে তাপ উৎপন্ন করে টার্বাইন চালানো হয়।

poat-image

সৌরশক্তি দ্বারা মূলত সূর্যের শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। আমরা সূর্যের আলো থেকে বিকিরণ গ্রহণ করতে পারি এবং এটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। এটি সাধারণত ফটোভোল্টাইক কোষ বা পিভি কোষ এর মাধ্যমে করা হয়। এই পিভি কোষগুলো সিলিকনের মত অর্ধ-পরিবাহী ধাতু দ্বারা গঠিত। যখন সূর্য আলো দেয় সে আলো পিভি সেল শোষণ করে নেয়, এরপর ফোটন সেই শক্তিকে ইলেক্ট্রন এ প্রবাহিত করে। ধাতুর মধ্যে এই ইলেক্ট্রনের প্রবাহ বৈদ্যুতিক শক্তির সৃষ্টি করে।

সৌর শক্তিকে পুনঃনবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যেহেতু এই শক্তির উৎসকে তাত্ত্বিক অর্থে পুননির্মাণ অথবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়। অনেকেই আবার তর্ক করে বলেন যে পারমাণবিক শক্তিকেও পুনঃনবায়নযোগ্য শক্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়, এবং সবাই একমত হবেন যে, পারমাণবিক শক্তি একটি টেকসই শক্তির উৎস। যদিও পারমাণবিক শক্তি অসীম নয়, তবে এটির পেছনে যে পরিমাণ অপচয়  হয় তার তুলনায় এটি অনেক বেশী শক্তি সরবরাহ করে।

poat-image

১৯৫৪ সালে রাশিয়া প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য APS-1 নামীয় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেন। বর্তমানে বিশ্বে সচল অবস্থায় অথবা নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে এমন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৪৫০ টি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে ৯৯ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রাশিয়া, চীন, এবং ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে একসাথে যোগ করলে সে সংখ্যা পাওয়া যাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার চেয়ে বেশী সংখ্যক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।

প্রথম সৌর কোষটি আবিষ্কৃত হয় ১৯৪১ সালে। আজ পৃথিবীতে ৭৫ টির বেশী সৌর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে যার ধারণ ক্ষমতা ০.২৫ মেগাওয়াটের চেয়েও বেশী।

পারমাণবি শক্তি বিশ্বের মোট শক্তির ৪.৮% সরবরাহ করে, যেখানে সৌর শক্তি ১.৪% এর কম শক্তি সরবরাহ করে। বিশ্বের প্রায় ১০.৬% বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় পারমাণবিক শক্তি থেকে, যেখানে সৌর শক্তি মাত্র ৬.৩% এর কাছাকাছি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। আমাদের অধিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য পারমাণবিক শক্তিকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।

poat-image

চেরনোবিল এর মত ভয়ানক দূর্ঘটনার দিকে তাকালে বলতে হয়, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বিপদজনক। অনেকেই আবার এর ক্ষতিকারক বিকিরণ, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক চুল্লির দূর্ঘটনা ভয়ে পারমাণবিক শক্তি বিপক্ষে থাকতে চান। কিন্তু বাস্তবতার দিকে লক্ষ্য করলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে দূর্ঘটনায় মারা যাওয়ার মৃতের সংখ্যা খুবই কম।

poat-image

পারমাণবিক শক্তিকে ছোট করে দেখা চলবে না, এটি সম্ভবত সৌর শক্তির তুলনায় অধিক নিরাপদ। সাম্প্রতিক ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলা যায়, সৌর শক্তির কেন্দ্রগুলোতে প্রতি টেরাওয়াট ঘন্টায় মৃত্যুর হার ০.৪৪%। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রগুলোতে প্রতি টেরাওয়াট ঘন্টার মৃত্যুর  হার ০.০৪%। এই ব্যাপার নিয়ে আরো অনেক বেশী গবেষণা করা হচ্ছে, কিন্তু যদি পারমাণবিক শক্তি সত্যি নিরাপদ বলে গণ্য হয়, তাহলে দেখা যাবে একদিন বিশ্বে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশী হবে।

poat-image

পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রে মৃত্যু ঝুঁকি অনেক কম, কিন্তু সৌর শক্তির তুলনায় এর খরচ কি কম?  যুক্তরাষ্ট্রে, সৌর শক্তির বেলায় প্রতি কিলোওয়াট-ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ১২ সেন্ট এর কাছাকাছি। কিন্তু প্রতি কিলোওয়াট-ঘন্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারমাণবিক শক্তির বেলায় ব্যয় হয় মাত্র ২ সেন্ট এর কাছাকাছি।

অর্থাৎ, পারমাণবিক শক্তি প্রক্রিয়া করতে সৌর শক্তির প্রায় ৬ ভাগের ১ ভাগ খরচ হয় মাত্র। এছাড়াও, সৌর শক্তি উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন হয়। একটি সৌর ফটোভোল্টাইক প্যানেল এর জন্য প্রায় ৪৫ বর্গ মাইল জায়গার প্রয়োজন হয়। ঐ প্যানেল এ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ঠিক একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুধুমাত্র একটি মাল্টি-রিয়েক্টর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রই যথেষ্ট। অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের জন্য অনেক কম জায়গার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সত্যি করে বলে গেলে, সৌর শক্তি গুলোর প্যানেল মানুষের বাড়ির ছাদের উপর বা বিল্ডিং এর উপর দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু পারমাণবিক প্যানেলগুলো তা পারে না।

poat-image

ফ্রান্স হলো পারমাণবিক শক্তির এক বড় ফ্যান। তাদের ৭৫% বিদ্যুৎ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। ফ্রান্স এর পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার আসলেই লোভনীয়, বিশ্বের বিদ্যুৎ রপ্তানির ক্ষেত্রে তারা সবার চেয়ে এগিয়ে। মোট ৪১৯ বিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তারা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে আছে, আর প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তারা ৭৯৮ কিলোওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন করে।

poat-image

জার্মানি এবং চীন তাদের জন্য সৌর শক্তি উৎপাদনের পথ সুগম করে রেখেছে। তারা ৮০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ফটোভোল্টাইক শক্তি কেন্দ্র স্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সৌর বিদ্যুৎ সমর্থন করে না। তারা তাদের ফটোভোল্টাইক শক্তি কেন্দ্র থেকে মাত্র ২৫,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ পেয়ে থাকে। যুক্তরাজ্য তাদের স্থাপিত ফটোভোল্টাইক শক্তি কেন্দ্র থেকে ১ লক্ষ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। যদিও বিটলস এর জন্মস্থান হিসেবে এটি অনেক কম।

বিদ্যুৎ শক্তির উৎস হিসেবে পারমাণবিক এবং সৌর শক্তি উভয়েরই প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যদি আমরা শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি, তাহলে বলতে পারি যে আমাদের সমাজ দিন দিন অগ্রসর হতে থাকবে।

আশা করি আপনারা সৌর এবং পারমাণবিক শক্তির যুদ্ধটি উপভোগ করেছেন। আপনার কাছে কোন শক্তির উৎসটি ভবিষ্যতে অগ্রাধিকার পাবে বলে মনে হয়? আমাদেরকে কমেন্ট এর মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না।  

আপনি কি সাহায্য পেয়েছেন

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন নিবন্ধন করুন