সুন্দরবনের হাট বাগেরহাট

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের একটি উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট। প্রাচীন সমতটের এই জনপদের সমৃদ্ধির ইতিহাস উপমহাদেশের বহু প্রাচীন জনপদের সমকালীন ও সমপর্যায়ের। ইউনেসকো ঘোষিত বাংলাদেশে যে তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান রয়েছে, তার দুটির গর্বিত অবস্থান এই বাগেরহাটে। এর একটি হচ্ছে – ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদসহ খানজাহান (রহ:) এর কীর্তি, অন্যটি প্রকৃতির অপার বিষ্ময় সুন্দরবন। বাগেরহাটকে বলা হয় ঐতিহাসিক মসজিদের নগরী। যা বর্তমানে সাংস্কৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। মধ্যযুগে নির্মিত মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শণগুলোর জন্য বাগেরহাট নাম টির সঙ্গে সব সময় মিশে থাকবে হযরত খান জাহান (রহ:) এর (খান উল আযম উলুঘ খান-ই-জাহান) স্মৃতিবিজড়িত গৌরবময় কীর্তি। বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ১৫টি শহরের তালিকায় (ফোর্বস) রয়েছে এই জেলার নাম। খুলনা থেকে ১৫ মাইল দক্ষিণ পূর্ব দিকে এবং ঢাকা থেকে ২০০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিশে বাগেরহাট জেলার অবস্থান।

poat-image

খ্রীষ্টিয় চৌদ্দ শতকে সুলতানী আমলে আজকের বাগেরহাট ছিলো খলিফাতাবাদের রাজধানী। খান-উল-আযম উলুঘ খান-ই-জাহান গৌড়ের সুলতানদের প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমান যশোর, খুলনা ও বাগেরহাটের বড় একটি এলাকা নিয়ে গঠিত এই খলিফাতাবাদ শাসন করতেন। সমসাময়িক সময়ের পর্তুগীজদের তৈরি এই অঞ্চলের মানচিত্রে কিউপিটাভাজ নামে যে নগর রাষ্ট্রের উপস্থিতি আছে সেটিকেই ঐতিহাসিকেরা খান জাহানের  খলিফাতাবাদ বলে স্থির করেছেন।

অনেকের মতে, মুঘল আমলে বাখরগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা (বরিশালের শাসক) আগা বাকেরের নামানুসারে এই স্থানের বা হাটের নামকরণ করা হয়েছিল বাকেরহাট। কালক্রমে তা বাগেরহাট-এ পরিণত হয়। আবার অনেকের মতে পাঠান জায়গীরদার বাকির খাঁর নাম থেকে বাগেরহাট। তবে এসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত যুক্তির সংকটও রয়েছে। অনেকের মতে, প্রাচীণ কালে বর্তমান বাগেরহাট ছিলো সুন্দরবনের অংশ। তখন এখানকার কোন লোকালয়ে বাঘের উপদ্রব ছিলো। আর সেজন্যই হয়তো কোন রসিক ব্যক্তি এই স্থানকে বাঘের হাট বলে নাম দিয়েছিলেন। বাঘের সেই হাটের অপভ্রংশ রূপই আজকের বাগেরহাট।

poat-image

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাগেরহাট জেলা ছিল ৯ নং সেক্টরের অধীন। ২১ এপ্রিল পাকসেনারা খালিশাখালী ও বাবুগঞ্জ বাজারে প্রায় ২০০ লোককে হত্যা করে। মোড়েলগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে রাজাকারদের লড়াইয়ে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং তারা শরণখোলা উপজেলার ত্যাঁড়াবাঁকা খালের মধ্যে শতাধিক লোককে হত্যা করে। ৩ মে কচুয়া উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের শাখারিকাঠী হাটে পাকসেনারা ৪২ জন লোককে হত্যা করে। ২১ মে রাজাকারেরা রামপাল উপজেলার বেশসংখ্যক লোককে হত্যাসহ ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ২৫ আগস্ট ফকিরহাট উপজেলার বাহিরদিয়া ইউনিয়নের মানসায় পাকসেনা ও রাজাকারেরা মিলিতভাবে ৯ জন এবং ১৫ অক্টোবর কচুয়া উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নের ভাসা বাজার থেকে ৭০ জন নিরীহ বাঙালীকে ধরে নিয়ে গ্রামের ভাসারহাট পুলের কাছে হত্যা করে। এছাড়াও স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মোল্লাহাটের চাকুলিয়া (চরকুলিয়া) নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকসেনাদের লড়াইয়ে একজন ক্যাপ্টেনসহ ২০০ পাকসেনা নিহত হয়।

poat-image

ইংরেজদের অধিকারে আসার পর, এই অঞ্চল প্রথমে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ শাসনে চলে যায়। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিসের শাসন আমলে যশোরকে জেলায় পরিণত করা হয়। ১৮৪২ সাল পর্যন্ত খুলনা ছিল যশোর জেলার একটি মহকুমা এবং বাগেরহাট ছিল খুলনা মহকুমার অন্তর্গত একটি থানা। ১৮৪৯ সালে মোরেল উপাধিধারী দুজন ইংরেজ বাগেরহাটে মোরেলগঞ্জ’ নামক একটি বন্দর স্থাপন করেন। ১৮৬১ সালের (খ্রিষ্টাব্দ) ২৬শে নভেম্বর মোড়েল-রহিমুল্লাহ নামক এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ (নীল বিদ্রোহ) হয়। এই সময় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সেই সংঘর্ষের কারণেই তিনি প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাগেরহাটে একটি মহকুমা স্থাপন করার সুপারিশ করেন। এই সুপারিশের সূত্রে ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট যশোর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমায় রূপান্তরিত হয়। ১৮৮২ সালে খুলনা, সাতক্ষিরা ও বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে গঠিত হয় খুলনা জেলা। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী বাগেরহাট জেলা হিসেবে উন্নীত হয়।

বাগেরহাট জেলা সাধারণ তথ্যঃ

আয়তন: ৩,৯৫৯.১১ বর্গকিলোমিটার।

পৌরসভা: ৩টি: বাগেরহাট পৌরসভা (বাগেরহাট সদর), মোংলা পোর্ট পৌরসভা (মোংলা) এবং মোড়েলগঞ্জ পৌরসভা (মোড়েলগঞ্জ)

জেলায় মোট ইউনিয়নের: সংখ্যা ৭৫টি।

গ্রামের সংখ্যা : ১,০৪৭ টি।

নদ-নদী সংখ্যা: ৩২ টি।

৯ টি উপজেলা: এগুলো হলো: কচুয়া,চিতলমারী,ফকিরহাট,বাগেরহাট সদর,মোংলা,মোড়েলগঞ্জ,মোল্লারহাট,রামপাল এবং শরণখোলা। 

poat-image

১. ষাট গম্বুজ মসজিদ ২. খান জাহান আলী -এর মাজার ৩. সুন্দরবন ৪. মংলা বন্দর ৫. রেজা খোদা মসজিদ ৬. জিন্দা পীর মসজিদ ৭. ঠান্ডা পীর মসজিদ ৮. সিংগাইর মসজিদ ৯. বিবি বেগুনি মসজিদ ১০. চুনাখোলা মসজিদ ১১. নয় গম্বুজ মসজিদ ১২. কোদলা মঠ ১৩. রণবিজয়পুর মসজিদ ১৪. দশ গম্বুজ মসজিদ ১৫. সুন্দরবন রিসোর্ট, বারাকপুর ১৬. চন্দ্রমহল, রনজিতপুর ১৭. খান জাহান আলী বেসামরিক বিমান বন্দর

poat-image

রুদ্র মোঃ শহিদুল্লাহ, কবি

ড. নীলিমা ইব্রাহীম, লেখক

প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাইদ, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

অধ্যাপক ডঃ স্বরোচিষ সরকার, লেখক ও গবেষক

দিব্যেন্দু দ্বীপ, লেখক ও সাংবাদিক

আপনি কি সাহায্য পেয়েছেন

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন নিবন্ধন করুন