২০৫০ সালে মানুষের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল কত হবে?

আপনি যদি উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করতেন তাহলে হয়ত আপনি ৩০ থেকে ৪০ বছর বেঁচে থাকতেন। ১৮০০ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিলো মাত্র ৩৫ বছর। কিন্তু যখন থেকে ডাক্তাররা অস্ত্রপাচার করার পর নিয়মিতভাবে হাত পরিষ্কার করা শুরু করলো (যেটি তারা আগে করতো না) তখন থেকে মানুষের গড় আয়ু বাড়তে শুরু করলো। এই শতাব্দীর ১৯২০ সালের দিকে কানাডাতে শিশু মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। কিন্তু এখন পেনিসিলিন আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে, এবং হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক স্যানিটেশন এর সুব্যবস্থা থাকার কারণে মানুষের গড় আয়ুর হার বেড়ে গিয়ে ৭১ বছরে দাড়িয়েছে (বলে রাখা ভাল, ২৫০ বছর পূর্বেও মানুষের গড় আয়ু এর দ্বিগুণ ছিল)। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, মানুষের গড় আয়ু কী বর্তমান হারে বাড়তে থাকবে? আগামী ৩০ বছরে কী কী বিষয়গুলো মানুষের আয়ুকে দীর্ঘায়িত করবে?

গড় আয়ু নির্ণয়

গাণিতিকভাবে, ড্রাইভিং বা পরিবহণ দূর্ঘটনাজনিত কারণগুলো একটি দেশের মানুষের গড় আয়ুর উপর প্রভাব ফেলবে না। শুধু এটি মনে রাখুন, একটি দেশের মানুষের গড় আয়ু অনেকগুলো কারণের উপর নির্ভর করে যেমন জনস্বাস্থ্য, রোগের প্রাদুর্ভাব, দূর্ভিক্ষ যানবাহনের নিরাপত্তা, এবং শিশু মৃত্যুর হার, এছাড়া ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বিষয়ক সকল কারণ একটি দেশের গড় আয়ুতে প্রভাব ফেলে যেমন ধুমপান,মদ্যপানএবং মাদক সেবন, এছাড়াও সামাজিক অনেক কারণও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যেমন বন্দুক নিয়ন্ত্রণ, খুনের হার, অপরাধ, যুদ্ধ, এবং বেসামরিক অস্থিতিশীলতা। তাই বলা যায়, যে দেশ যত বেশী উন্নত, যে দেশের নাগরিক জন্য রয়েছে উচ্চ কর্মসংস্থানের এর সুবিধা, ভাল স্বাস্থ্যসেবা,এবং সামাজিক সহযোগিতার ব্যবস্তা, সে দেশের নাগরিকদের গড় আয়ু স্বাভাবিকভাবেই বেশী হবে।

গড় আয়ু বৃদ্ধিকরণ

মনে রাখবেন যে, আমরা যদি জন্মহার একই রেখে আগামী ৩০ বছরে বা ততোধিক বছরগুলোতে আমাদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৫ থেকে ১০ বছর বৃদ্ধি করতে চাই তাহলে আমাদের নাগরিকদের সামাজিক, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং জীবনধারণের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। ১৯৯০ সালে বিশ্বের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৬৫.৩ বছর, এবং ২০১৩ তে সেটি বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৭১.৫ বছরে। এই হার আবার এর কয়েক বছর পর নেমে গিয়ে ৭১.৪ বছরে দাঁড়ায়, কিন্তু সাধারণত এই হার সময়ের সাথে সাথে বেড়েই চলেছে, এবং আশা করা হয় আগামী ৩০ বছর পরে অর্থাৎ ২০৫০ সালের মধ্যে একজন স্বাভাবিক মানুষের গড় আয়ু ন্যূনতম ৬ বছর বৃদ্ধি পাবে। এই প্রেক্ষিতে বলতে পারি, আগামী ৩০ বছর পর আমরা আরো ৬ বছর বেশী আয়ু লাভ করবো।

গড় আয়ু বৃদ্ধিকরণ

কিন্তু এইখানেই সবকিছু শেষ হয় নি। ২০৫০ সালের মধ্যে আমরা অনেক নতুন প্রযুক্তি দেখতে পাব, যেসব দেশগুলো সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং এই নতুন নতুন প্রযুক্তির ধারণ করতে পারবে সে দেশের জনগণের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাবে এটা নিশ্চিত। একবিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রতিদিনই স্টেম সেল থেরাপি ব্যবহার করা হচ্ছে, এছাড়াও জৈবপ্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে একজন স্বাভাবিক মানুষের গড় আয়ু দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা বেশ কিছু নতুন থেরাপির ব্যবহার দেখতে পাবো, যেমন এক সময় মানুষ যে যে জিনগুলোর কারণে দীর্ঘায়ু লাভ করে সে জিনগুলোকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে এবং সেগুলোর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির করার লক্ষ্যে কাজ করবে, এবং তাতে করে মানুষ আরো দীর্ঘ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনের অধিকারী হবে।

গড় আয়ু বৃদ্ধিকরণ

এছাড়াও বর্তমানে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মানব শরীর পুনর্বিন্যাসে কোষীয় এবং আণবিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা করতে শুরু করেছে, একে আমরা ন্যানোবোট নামে জানি। এই বোট বিষয়ে আরো বলতে গেলে, এই রোবোটিক্স এর মাধ্যমে মানুষের শরীরের অংশ প্রতিস্থাপন এবং পরিবর্ধন করা যায়, এমনকি মানসিক সমস্যার সমাধান ও করা যায়। যেমন মানসিক চিকিৎসায়  ব্রেইন ইমোলেশন এবং মাইন্ডস্ক্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহারের কারনে মানব জাতি অনেক বেশী উপকৃত হয়েছে।

যদিও কিছু কিছু সমালোচক এই ব্যাপারে তর্ক করে যে, যদিও বিদেশী অংশ ও উপকরনের ব্যবহার করে মানব দেহ সুদক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব, তবে এতে করে একজন জৈব মানুষের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে  এবং এভাবে একদিন সত্যিকার অর্থে মানব জাতির দীর্ঘায়ুর লাভের কথা আর আলোচনায় আসবেও না। কিন্তু  এটা বলা যায় যে, যতদিন পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্ক থাকবে, আমরা আমাদের শরীরের অন্যান্য অংশ যোগ করতে পারি বা বাদ দিতে পারি, এবং এতে করে থাকে রোবট বা অন্য কিছুর মতো লাগলেও তারা দীর্ঘদিন বাঁচতে সক্ষম হবে।  কিন্তু সব খবর তো আর ভালো হয় না।

গড় আয়ু বৃদ্ধিকরণ

কিছু গবেষক পূর্বাভাস দেন যে জীবনধারার কিছু বিষয় যেমন স্থুলতা  মানুষের গড় আয়ুর হার হ্রাস করবে। ওলশ্যাঙ্কি এর মতো কিছু এপিডেমিওলজিস্টেরা এবং বার্ধক্যবিদরা সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশের ২ থেকে ৩ শতাংশ লোক স্থুলকায়,ডায়াবেটিস এবং অধিক ওজনের কারণে বিভিন্নভাবে রোগে জর্জরিত। এতে করে এই একবিংশ শতাব্দীতেও মানুষের গড় আয়ু  হ্রাস পাচ্ছে।

তাই, আমরা যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বাড়াতে চাই, আমাদেরকে খাবার এবং পানীয়ের ব্যাপারে অত্যধিক সচেতন হতে হবে। যখন ঐসব উন্নত প্রযুক্তি আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার করতে শুরু করি, বলে রাখা ভাল সেগুলোর বেশীর ভাগই ব্যবহার হবে অত্যন্ত ধনী এবং সম্পদশালী ব্যক্তির পেছনে, এতে করে হয়ত দেখা যাবে পৃথিবীর কোন বিশেষ ব্যক্তির আয়ু নাটকীয়ভাবে বেড়ে গিয়ে ২০০ বছর হবে।

গড় আয়ু বৃদ্ধিকরণ প্রযুক্তি

কিন্তু, সম্ভবত গড় পড়তায় ২০৫০ সালে একজন স্বাভাবিক মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে ৯০ বছরে দাঁড়াবে। মনে রাখা দরকার, গত ৩০ বছরে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছিল ৬ বছর, এবং যেহেতু প্রযুক্তি দিন দিন বিকশিত হচ্ছে, আগামী ৩০ বছরে এই হার অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

তাই আপনি যদি ২০৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন, এবং আপনি যদি আমদের আই লেখাটি দেখে থাকেন, দয়া করে আমাদের কমেন্ট সেকশন এ একটি নোট লিখে যাবেন, আমাদের অনুমিত গড় আয়ু হলো ৯০ বছর। এখন আমরা কত দূর রয়েছি সেটি জানাতে ভুলবেন না।  

অন্য সবার কাছে একটি প্রশ্ন রইলো, আপনি কি মনে করেন? এই দীর্ঘায়ু সমাজের জন্য ভাল নাকি ক্ষতিকারক? আমাদেরকে কমেন্ট এর মাধ্যমে জানিয়ে সহযোগিতা করুন।

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন