আমেরিকার সহ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ সমূহের অজানা তথ্য

বিশ্বের কম বেশী সব দেশেই দারিদ্রতা বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দেখা মিলে। উদাহারণ স্বরুপ, আমেরিকার মত উন্নত দেশেও দারিদ্রতা রয়েছে। তবে বলে রাখা ভাল, আমেরিকা তাদের দেশের দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারের তরফ থেকে খাদ্য সুবিধা ও মাথা গুজার জন্য ছাদের ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকে। অন্যদিকে, দ্যা গার্ডিয়ানের ২০১৭ সালের রিপোর্ট মোতাবেক ব্রিটেন তাদের দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশুকে দরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করে যেখানের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ শিশু এসেছে কর্মী পরিবার থেকে। ব্রিটেন সরকারও তাদের দেশের দরিদ্র শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়ে থাকে। এমনকি সে দেশের সরকার তাদের দরিদ্র শিশুদের জন্য খাদ্য কোষাগার থেকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে থাকে। এই হলো পৃথিবীর দুইটি উন্নত দেশের দরিদ্র জনগণের কথা। চলুন এবার দেখে আসা যাক চরম দারিদ্র বলতে যা বোঝায় সে ধরনের মানুষগুলো কিভাবে বেঁচে আছে তা দেখে নেই। তাদের জন্য কি আদৌ কোন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? আমরা যদি তথ্য-উপাত্তের দিকে তাকাই, তাহলে আমরা প্রথমেই দেখতে পাব, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর নাম সেসব দেশগুলোর মোট ব্যবহার যোগ্য সম্পদের উপর ভিত্তি করে পরিবর্তন হয়ে থাকে। কিন্তু তার পরো কিছু দেশের নাম কম বেশী সব তালিকায় থেকেই যায়। সেসব দেশগুলো প্রকৃত গরীব বলতে যা বোঝায় তাই। পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে অধিকাংশই আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত। আমরা এখানে সেসব দরিদ্র দেশগুলো নিয়ে আলোচনা করবো। এছাড়াও এমন কিছু দেশ নিয়ে আলোচনা করব যেগুলো হয়ত পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে পড়ে না , কিন্তু দেশগুলো পৃথিবীর যে অংশে বাস করে সে অংশের জন্য তারা অন্যান্যদের তুলনায় দরিদ্র।

poat-image

প্রথমেই আমরা ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপ নিয়ে আলোচনা করব। দ্বীপটির নাম মাদাগাস্কার। এই দেশটি আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। যদিও দেশটি তাদের অনন্য বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু এটি পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে একটি। জাতিসংঘের ২০১৫ সালের রিপোর্ট মোতাবেক মাদাগাস্কারের প্রায় ২৫ মিলিয়নের বেশী লোকজনের জন্য কোন নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। একই বছর দেশটির কিছু সংখ্যক অতিশয় ক্ষীণকায় ও জরাজীর্ণ  শিশুর ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় চলে আসে। এই ছবিগুলো এতই হৃদয় বিদারক ছিল যে সেগুলো মানুষজনকে আশির দশকের আফ্রিকায় ঘটে যাওয়া আফ্রিকায় ঘটে যাওয়া দূর্ভিক্ষের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মাদাগাস্কার মোট দশজনের মধ্যে নয় জনকেই দিনে ২ ডলারের কম খরচে জীবন চালাতে হয়। ক্ষরা, বন্যা ও প্রলয়ংকারী মহামারীর কারণে দেশটিতে একটি নিরাপত্তাহীন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, রোগ-বালাই আর অপুষ্টিজনিত সমস্যাতো রয়েছেই। ইউনিসেফ এক রিপোর্টে দুঃখ প্রকাশ করে বলে,  দেশটি  আন্তর্জাতিক অনুদান দাতার কাছ থেকে ব্যাপকভাবে অবহেলিত হয়ে আসছে।

poat-image

আমরা যদি একটু এশিয়ার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, এখানের সবচেয়ে গরীব দেশটি হলো আফগানিস্তান। তুলনামূলকভাবে এটি নেপালের চেয়েও বেশী গরীব। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, এই দেশটিতে দারিদ্রতা দিন দিন বেড়েই চলছে। তাদের হিসাব মতে প্রায় ১৩ লক্ষ আফগান লোক তাদের নিজ নিজ মৌলিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম। বলা হয়ে থাকে, রাজনৈতিক দ্বন্দের কারণে দেশটি অনুদান দাতাদের কাছে অনেক কম সাহায্য পাচ্ছে। আফগানিস্তানে চাকরির বাজার ও অবকাঠামোগত ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। আফগানিস্তানের অধিকাংশ জনগণই অশিক্ষিত ও অদক্ষ, এবং দিন দিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মনে করা হয়ে থাকে, দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩৪.৫ মিলিয়ন লোক খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে। আরো বলা হয়ে থাকে, দেশটি প্রায় ৩ মিলিয়ন এর মত লোক আফিম জাতীয় নেশায় আসক্ত। তাই বলা যায়, আফগানিস্তান এশিয়ার একটি দরিদ্রতম দেশ।

poat-image

আফ্রিকার বাইরে আরো একটি দরিদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে সেটি হলোঃ হাইতির ক্যারাবিয়ান জনগোষ্ঠী। অনেক সময় এটিকে পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র জাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিবিসির রিপোর্ট মোতাবেক, দেশটি যদি) ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে তবে তারজন্য তাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। বর্তমানে হাইতির জনসাধারণ নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক, অর্থনৈতিক অস্থায়িত্ব, এবং চরম প্রাকৃতিক দূর্যোগের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। উদাহারণস্বরুপ, ২০১০ সালের ভূমিকম্পে দেশটির অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়- ক্ষতি হয়েছে। হাইতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক চরম দারিদ্রতার মধ্যে বাস করে, এবং অপর এক-তৃতীয়াংশকে মোটামুটি গরীব হিসেবে ধরা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে, চরম দারিদ্র সীমার নিচে বসবাসকারী সেসব লোকের মাথাপিছু দৈনিক ব্যয় করতে পারে ১.২৩ ডলার, আর যারা মোটামুটি গরীব তাদের দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় করতে পারে ২.৪১ ডলার। ২০১৭ সালের বোর্গেন প্রজেক্ট এ বলা হয়, হাইতির ১০ মিলিয়নের অধিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্ধেকের কোন চাকরি নেই। তাদের গৃহস্থলিতে কোন কোন খাবার পানির সরবরাহ নেই। এছাড়া রোগ-বালাই এবং অপুষ্টিতো রয়েছেই।

poat-image

দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে গরীব দেশে বলে মনে করা হয় বলিভিয়াকে। ১১ মিলিয়ন লোকের বসবাস এই দেশে। এটি একটি মূলত দ্বীপ যার সীমান্তের চারদিকে ঘিরে আছে পেরু, প্যারগুয়ে ও চিলি। বিগত এক দশকে দেশটি তার চরম দারিদ্র সীমায় পৌঁছেছে। সেখানে দারিদ্রসীমা ৩৮.২% থেকে ১৬.৮% এ নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশী খারাপ অবস্থায় রয়েছে দেশটির গ্রাম্য এলাকায় বসবাসকারী মানুষজন। ইউনিসেফ এর হিসাব মতে বলিভিয়ার ৬০ শতাংশের ও বেশী লোক দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। এই দারিদ্রতার হার গ্রাম্য এলাকায় আরো বেশী, কারণ দেশটিতে শহরের সাথে গ্রামের যোগাযোগের জন্য অবকাঠামোগত অনেক ঘাটতি রয়েছে। সেদেশের গ্রামের অধিবাসীদের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহের কোন ব্যবস্থা নেই। বলিভিয়ার শতকরা ৫৮ জন মানুষ বস্তিতে বাস করে এবং তাদের বেশীরভাগই কোন মৌলিক সেবা পায় না, এমনকি তাদের পয়ঃনিষ্কাশনের কোন সুব্যবস্থা নেই। রিপোর্টটিতে আরো বলা হয়েছে, দেশটির ৬.২ শতাংশ লোকই হল বেকার।

poat-image

ইউরোপের বেশ কিছু সোর্স এর হিসাব মোতাবেক মোলডোবা হল সেখানের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। এরা হলো রোমানিয়া ও ইউক্রেন সীমান্তে অবস্থিত পশ্চিম ইউরোপীয় জাতি। দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, দেশটির শতকরা ৬ জন লোকের দৈনিক মাথাপিছু ২.৫০ ডলারের কম খরচে জীবন চালাতে হয়। এর চেয়েও বেশী খারাপ অবস্থায় জীবন চালাতে হয় সেদেশের গ্রামের অধিবাসীদের। গ্রামের বেশীরভাগ লোকের জন্য নিরাপদ পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। সেই কারণে ইতিমধ্যে প্রচুর লোকজন নিজ দেশ ত্যাগ করেছে এবং এখনো অনেক লোক দেশ ছাড়ার চেষ্টায় আছে। বোর্জেন প্রজেক্ট এর মতে, মোলডোবা অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত হতে চাইলে সেদেশের যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তারা নিজ দেশে যদি কোন ভবিষ্যত না দেখে তাহলে তারা কেন দেশে পড়ে থাকবে? ২০১৭ সালে একটা জনমত জরিপ নেওয়া হয়। জরিপের প্রশ্ন ছিলঃ মোলডোবার জনগণ কোন কোন সমস্যাগুলো নিয়ে বেশি চিন্তিত? বেশীরভাগ জনগণের উত্তর ছিল : দ্রব্যমূল্যের অত্যাধিক দাম, দারিদ্রতা, দূর্নীতি এবং রোগ-ব্যাধি। এছাড়া মোট উত্তরদাতাদের ৭৩.৩% জানায় তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যে পরিমাণ আয় করেন সে আয় তাদের একটি স্বাভাবিক জীবন যাত্রার জন্য যথেষ্ট নয়। এই জনমত জরিপটি মোলডোবার সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও প্রকাশিত হয়।

poat-image

আবারো ফিরে যাই আফ্রিকাতে। সেখানে এমন দুটি দেশ রয়েছে যেগুলো দরিদ্র দেশ নিয়ে তৈরিকৃত সকল তালিকায় দেখা যায়। এই দুটি দেশ হলো কংগো প্রজাতন্ত্র এবং মধ্যা আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র। কংগোর মাথাপিছু জিডিপির হার বিশ্বের সর্বনিম্ন বলে ধরা হয়। আবার সি.আই.এ. এবং অন্যান্য কিছু সোর্স এর মতে বিশ্বের সর্বনিম্ন জিডিপি হার হলো সোমালিয়ার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সোর্স মোতাবেক মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের জিডিপি হার হলো বিশ্বের সর্বনিম্ন।

poat-image

প্রথমেই আমরা কংগো প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা করবো। আফ্রিকায় এই দেশটি জাইরি নামে পরিচিত। কংগোর মোট জনসংখ্যা ৭৯ মিলিয়ন। যদিও দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে অনেক সম্পদশালী তবে দেশটির ৬৩ শতাংশ জনগণ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। তারা দৈনিক ১ ডলারের চেয়ে কম খরচে জীবন চালায়। বিশ্ব ব্যাংকের মতে এটা আসলেই দুঃখের ব্যাপার যদিও দেশটিতে রয়েছে আবাদযোগ্য ভূমি এবং এর নিচে মজুদ রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন গ্যাস, লোহা, সোনা, হীরা, প্লাটিনাম এবং ইউরেনিয়াম। এতো প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্বেও এই দেশের মাথাপিছু বাৎসরিক গড় আয় মাত্র ৮০০ ডলার। ইউরোপীয়ান জাতি দ্বারা দেশটিতে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট সংগঠিত হয়। এছাড়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা দেশটিতে যুদ্ধ বাধিয়ে দেশটির অবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। কংগোই মনে হয় পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা শান্তি নামক জিনিসটি একদম পায় নি। বর্তমানেও দেশটিতে চরম অশান্তি বিরাজ করছে। এখন দেশটি পরিচালিত হচ্ছে পশ্চিমাদের মদদে পরিচালিত স্বৈর-শাসক দ্বারা। দেশটিতে ক্ষরা, দারিদ্র ও রোগ-ব্যাধি লেগেই আছে যেকারণে সেখানকার মানুষের মাথাপিছু গড় বয়স ৫৯ বছরের বেশী আশা করা হয় না। এক কথায় সে দেশে যে পরিমাণ মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে তা নিয়ে এটি পুরো বই লিখা যাবে। কিছুক্ষণ আগেই বলেছি দরিদ্র জাতি হিসেবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র। এই দেশটি কংগোর সীমান্তবর্তী উত্তরে অবস্থিত। বলতে গেলে এই দেশটি খনিজ সম্পদ আর আবাদ্যযোগ্য ভূমিতে পরিপূর্ণ। প্রায় ৫ মিলিয়ন লোকের বসবাস এই দেশটিতে। এদের গড় মাথাপিছু বাৎসরিক আয় প্রায় ৭৫০ ডলার। যেখানে দেশটির প্রায় ৬৭ শতাংশ লোকের দৈনিক মাথাপিছু ১ ডলারেরও কম খরচে জীবন চালাতে হয়। প্রায় অর্ধেক জনগণ অশিক্ষিত, এবং প্রতিজন ব্যক্তি গড় পড়তায় তাদের শিক্ষাজীবনে মোটামুটিভাবে ৩.৫ বছর পর্যন্ত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়। আফ্রিকার দেশটিতে দ্বন্দ-সহিংসতা, দূর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রোগ-ব্যাধি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশটির লোকজনের মাথাপিছু গড় বয়স ৫১ এর কাছাকাছিতে নেমে এসেছে। যেহেতু, নানান রাজনৈতিক দ্বন্দের কারণে এই সহিংসতা এতো তাড়াতাড়ি শেষ হবার নয়, সেহেতু এই দেশটির নাম দরিদ্র দেশের তালিকায় আরো বেশ কিছু বছর ধরে রয়েই যাবে।

তোমার নিজ দেশের মানুষের জীবনযাত্রা কেমন? উপরে আলোচিত দেশগুলোর চেয়ে কতটা ভিন্ন? আমাদেরকে তা কমেন্ট এর মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না।

আপনি কি সাহায্য পেয়েছেন

সকল মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন নিবন্ধন করুন